উগ্রমৌলবাদীরা কেন সামাজিক ও মানবিক নয়?

আমরা দেখছি মাদ্রাসার সাথে কিছু ইংরেজি মাধ্যমের বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে আসা ছাত্রদের মধ্যে উগ্রপন্থার উত্থান ঘটছে। সর্বশেষ অধ্যাপক জাফর ইকবালের উপর হামলাকারীও মাদ্রাসার প্রোডাক্ট। হাজার হাজার শিক্ষার্থীর নিকট শ্রদ্ধাভাজন একজন মানুষকে হামলা করতে হলে চূড়ান্ত অমানবিক ও উগ্রমৌলবাদী-অসামাজিক হতে হয়। শিক্ষার প্রধান দুটি লক্ষ্য হল- শিক্ষার্থীদের সামাজিক ও মানবিক হিসাবে গড়ে তোলা। সামাজিক হতে গেলে সমাজ সম্পর্কে শুধু পুঁথিগত বিদ্যাই যথেষ্ট নয়, সমাজের মানুষ সম্পর্কে প্রত্যক্ষ সম্যক জ্ঞান প্রয়োজন। সামাজিকীকরণের জন্য সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষের সাথে মিশতে হয়, কথা বলতে হয়। ধনীক শ্রেণির অনেক সন্তানকেই থাকতে হয় গৃহবন্দী। নিজ ফ্লাটগুলো হয়ে উঠে বন্দিশালা। মায়ের সাথে সন্তানরা গৃহ থেকে বের হয়ে পাঠশালায় যায় যেন পুলিশের সাথে বন্দীরা যাচ্ছে এক বন্দিশালা থেকে আরেক বন্দিশালায়। পড়ার চাপে পাঠশালায় বন্ধুত্বকরণও হয় না। শিক্ষার চাপে শিক্ষার্থীদের শৈশব ও কৈশোরের স্বাভাবিক বিকাশটা হয় না। কওমি মাদ্রাসাগুলোতে শিশুরা গৃহচ্যুত হয় শৈশবেই। যে বয়সে মা-বাবার স্নেহ পাবার কথা সে বয়সে শিক্ষকের বেত্রাঘাত তাদের মেধার বিকাশ ঘটাতে পারে না। তারাও গুটি কয়েক শিক্ষার্থীর বাইরে আর কারো সাথে মেশার সুযোগ পায় না, খেলাধুলা ও সংস্কৃতি চর্চার সুযোগ পায় না। এরা যখন কোন উগ্রপন্থী নেতার সান্নিধ্যে আসে তখন নিজেও বিভ্রান্ত হয়ে উগ্রপন্থা ধারণ করে। তবে উগ্রমৌলবাদীদের সিংহভাগই হতাশাগ্রস’ দরিদ্র পরিবার থেকে আসা মাদ্রাসার মানহীন শিক্ষাপ্রাপ্ত ছাত্রই।
মানুষের মানবিক গুণাবলী অর্জনের জন্য সামাজিকীকরণ একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শুধু মুখস্তের মাধ্যমে কারো পক্ষে মানবিক গুণাবলী অর্জন করা সম্ভব নয়। এই আচরণটা রপ্ত হয় অনুশীলনের মাধ্যমে। সামাজিক সংগঠন শিক্ষার্থীদের সামাজিক ও মানবিক হতে সহায়তা করে। আন্তস্কুল ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা, স্কুলের আভ্যন্তরীণ, ইউনিয়ন বা উপজেলা ভিত্তিক বিভিন্ন প্রতিযোগিতা তাদের আরো সুযোগ করে দেয়। নটরডেম কলেজে দেখেছি ছাত্ররা ডিবেট ক্লাব, চেজ ক্লাব, নেচার ক্লাব ইত্যাদি করছে এবং অনুশীলন করছে। ফলে তারা পরবর্তী জীবনে সামাজিক ও মানবিক মানুষ হিসাবে এগিয়ে থাকছে। যারা সামাজিক সংগঠনের সাথে জড়িত হওয়ার সুযোগ পান না, তাদের উগ্রপন’ী হওয়ার ঝুঁকি বেশি। সমাজ বিচ্ছিন্ন বন্দীদের আলোর পথে যাত্রা করা অসম্ভব। মাদ্রাসায় দুমাস শিক্ষকতা করার সুযোগ আমার আছে। ওখানে পড়াশোনাটা হয় না, আর যাই হোক। শিক্ষকদেরও অনুশীলন ও প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে। বিস্ময়কর যে, একই ক্লাসে পড়ুয়াদের মধ্যে বয়সের পার্থক্য বেশি থাকে। তাদের ঘৃণা বিদ্বেষ শিখিয়ে মানবিক ও সামাজিক মানুষ বানাতে পারবেন না। সামাজিক ও মানবিক মানুষ হওয়া বা মেধার বিকাশপ্রাপ্ত হওয়া কোন আকস্মিক বিষয় নয়, এগুলো অর্জন করতে হয়।
মৌলবাদী মাত্রই কুপুত্র ও কুলাঙ্গার
আমার ঘণিষ্ঠতম বন্ধু অসীম কুমার বর্মন। আমরা ছিলাম মানিকজোড়, হরিহর আত্মা। ও তখন ঢাকা কলেজে আর আমি নটরডেমে পড়ি। দুই বন্ধু একসাথেই বেশিরভাগ গ্রামে আসি, ঢাকা যাই, একসাথেই চলাফেরা করি। ধর্মীয় ও সামাজিক বিষয়ে আমরা দুজনই ছিলাম উদার। তো একদিন আমি ও অসীম আমাদের বাজারের জামে মসজিদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। নিয়মিত নামাজ পড়তাম বলে অস্থায়ী মোয়াজ্জিন আমাকে খুবই স্নেহের চোখে দেখতেন। আমিও মামা বলতাম। তিনি ডাকলেন। কাছে গেলে বললেন, তুই যে একটা মালাউনের সাথে ঘুরিস, আখেরাতে কি জবাব দিবি?
আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। অসীমের সামনে নিজেকে অসহায় মনে হল। ভীষণ লজ্জা পেলাম। অসীম আমাকে টেনে নিয়ে গেল। ও বলল, তোর লজ্জা পাওয়ার কিছু নাই। এদেশে আমরা হিন্দুরা এভাবে নাজেহাল হয়ে অভ্যস্ত। তুই কষ্ট পাইস না।
আমি ভীষণ কষ্ট পেয়েছি। ওনি এমন একটা প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারেন, অন্যকে অপদস্ত করতে পারেন এটা ভাবনার বাইরে ছিল। এখন এই জীবনের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, মৌলবাদী মাত্রই প্রতিক্রিয়াশীল। তারা অন্যকে অপদস্ত করে মজা পায়। হিন্দু মৌলবাদীরা প্রকাশ্যে না হলেও তারা নিজেরাও নিজেদের মধ্যে থেকেও প্রায়শই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকায় মুসলিম মৌলবাদীরা প্রায়শই নির্মম ও অমানবিক হয়ে উঠে তাদের আচরণে। আমার নিকটআত্মীয় এক মৌলবাদীকেও দেখেছি বহুবিধ নির্মম আচরণ করতে। সে তার স্ত্রী, মা, প্রতিবেশি ইত্যাদির উপরও তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। আমার বিরুদ্ধে তার ফেসবুক রিকুয়েস্ট গ্রহণ না করায়, একটি ফেক আইডি খুলে অনবরত মিথ্যা প্রচারণা চালালো কিছুদিন। পরে জানলাম, ওনার বাবাও মৃত্যুর আগে তাকে ‘কুপুত্র’ বলে অভিধা দিয়ে গেছেন; ভাইয়েরা বলল, ‘কুলাঙ্গার’। চাকুরি জীবনে দেখছি, মৌলবাদীরা কি পরিমানে মানুষকে অসম্মান করে, দুর্নীতি করে, সহকর্মীদের সাথে অশোভন আচরণ করে? আমার এক সহকর্মী মৌলবাদী দুর্নীতির টাকাকে এরা সন্তানের ‘হক’ বলে মনে করতো। মৌলবাদীদের কখনোই মানুষ বলে মনে হয়নি। এখন বুঝি, যে ধর্মেরই হউক মৌলবাদী মাত্রই কুপুত্র ও কুলাঙ্গার। উগ্রমৌলবাদী মানে মানবতার শত্রু। আর জঙ্গী মানে খুনি।
একটি সাপকে বিশ্বাস করতে পারেন, আঘাতের ভয় না পেলে সে আপনাকে দংশন করবে না। কিন’ আপনি নিশ্চিত থাকেন একজন মৌলবাদী বা জঙ্গী সম্পূর্ণ বিনা কারণে আপনার প্রাণ সংহার করে দিবে। আপনার জীবন অতিষ্ঠ করে ফেলবে। আপনার বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচারণা দিয়ে সমাজে অসম্মানিত করে ফেলবে। উগ্র মৌলবাদী জঙ্গী তৈরি হয় চরম-মহা-বাজে রকমের মূর্খতা থেকে।
মৌলবাদীদের আচরণ
মৌলবাদীদের কাছ থেকে অহরহই দেখতে হয়। এদের কিছু বৈশিষ্ট স্পষ্ট চোখে পড়ে। এরা মারাত্মক প্রতিক্রিয়াশীল। অনেক সময়ই সম্পূর্ণ না শুনেই, না বুঝেই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। এরা অন্যের উপর দোষ চাপাতে পারঙ্গম। যে দোষে নিজে দোষী সে দোষও অন্যের উপর চাপায়। নিজের ৯৫ ভাগ সমস্যা তাদের চোখে পড়ে না। অন্যের ৫ ভাগ ত্রুটিও মানতে চায় না। জানার বিষয়ে তারা বিমূখ। এর অবশ্য আরেকটা কারণ অলসতা। মৌলবাদীরা এতো কম জানে এবং জানার চেষ্টা করে যে, এ নিয়ে তাদের কোন লজ্জাবোধও হয় না। কুতর্ক করতে তারা পছন্দ করে। ধর্ম দিয়ে অন্যকে আক্রমণ করে। মানুষকে নাজেহাল করে তারা মজা পায়। মৌলবাদীরা মারাত্মকভাবে দুর্নীতিগ্রস’। তারা ঘুষ-দুর্নীতিকে সন্তানের হক বলে মনে করে। কেউ কেউ টুপি খুলে ঘুষটা খায়, কেউ আবার টুপির মধ্যেও খায়। মৌলবাদীরা শুধু হিংস্ত্র নয় তারা আসলে বেকুব এবং কর্মবিমূখ। নিজ পরিবারের স্বার্থটাও বুঝে না। নিজেরটাও অনেক সময় উল্টো বুঝে ক্ষতিগ্রস’ হয়। এ কারণে অধিকাংশ মৌলবাদীই দরিদ্র বা নিম্ন মধ্যবিত্ত। তাদের যৌন তাড়নাটা একটু বেশি। লালসালুর মজিদই আদর্শ মৌলবাদী। মৌলবাদীদের মধ্যে একটি জেলার মৌলবাদীরা ভয়ংকর। তাদের বিরুদ্ধে মাহাত্মা গান্ধীর ছাগল খেয়ে ফেলার অভিযোগও রয়েছে। আমার মনে হয়, দেশে ধর্মান্ধতা-মৌলবাদ ছড়াতে তাদের ভূমিকাই সিংহভাগ। স্ত্রীকে ওই জেলায় রেখে তারা বাংলাদেশজুড়ে মৌলবাদ বিস্তার করে বেড়ায়। দুই-পাঁচ বছর স্ত্রীর কাছ থেকে দূরে থেকেও সন্তানের পিতা হয়েছে আবার ধর্মালয়ে তাদের বিরুদ্ধে শিশুদের যৌন নিপিড়নের অভিযোগও রয়েছে। ধরা পড়লেই বলে দেয়, শয়তানের কাজ।