পরিচয়, ভালোবাসা ও ব্যক্তিগত মর্যাদা
আমি সমকামী, কিন্তু এটাই কি আমার পুরো পরিচয়?
মানুষ আমাকে যখন শুধু “সমকামী” পরিচয়ে দেখতে চায়, তখন আমার খুব অদ্ভুত লাগে।
আমি একজন সন্তান। আমি একজন ব্লগার। আমি ভালোবাসি, অভিমান করি, স্বপ্ন দেখি, ভয় পাই। আমার পরিবার আছে। আমার প্রিয় মানুষ আছে। ভবিষ্যৎ নিয়ে আমারও পরিকল্পনা আছে।
তারপরও আমার যৌন অভিমুখিতা প্রকাশ হওয়ার পর যেন আমার অন্য সব পরিচয় ছোট হয়ে গেল।
প্রশ্ন হলো, কেন?
একজন বিষমকামী মানুষকে আমরা প্রতিদিন তার যৌন অভিমুখিতা দিয়ে পরিচয় করিয়ে দিই না। কিন্তু একজন সমকামী মানুষের ক্ষেত্রে তার ব্যক্তিগত পরিচয়ই যেন তার পুরো অস্তিত্ব হয়ে দাঁড়ায়।
আমি চাই না কেউ আমাকে বিশেষ সুবিধা দিক।
আমি শুধু চাই আমাকে সম্পূর্ণ একজন মানুষ হিসেবে দেখা হোক।
আপনি আমার সম্পর্ককে সমর্থন না-ও করতে পারেন। আমার লেখার বিরোধিতা করতে পারেন। কিন্তু আমার সঙ্গে দ্বিমত করার অর্থ আমার মানবিক মর্যাদা অস্বীকার করা নয়।
আমি সমকামী, কিন্তু আমি শুধু সমকামী নই।
আমার পরিচয়ের একটি অংশকে কেন্দ্র করে আমার পুরো জীবনকে বিচার করা বন্ধ হওয়া প্রয়োজন।
কারণ আমার যৌন অভিমুখিতার আগেও একটি পরিচয় আছে।
সেটি হলো, আমি মানুষ।
আশিককে ভালোবাসার জন্য আমি লজ্জিত নই
আশিক আমার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম।
আমাদের সম্পর্ক নিখুঁত ছিল না।
কোনো সম্পর্কই হয়তো নিখুঁত নয়।
আমাদেরও অভিমান ছিল, ভয় ছিল, অনিশ্চয়তা ছিল।
কিন্তু ভালোবাসাও ছিল।
আমি কেন সেই ভালোবাসার জন্য লজ্জিত হব?
আমাদের দুজনের লিঙ্গ একই বলে কি অনুভূতির মূল্য বদলে যায়?
আমি জানি, আমাদের সম্পর্ক অনেকের বিশ্বাসের সঙ্গে মিলবে না।
সেটা আমি মেনে নিতে পারি।
কিন্তু অন্যের আপত্তির কারণে নিজের জীবনের সত্যিকারের অনুভূতিকে মিথ্যা বলতে পারি না।
আশিককে ভালোবাসা আমার জীবনের এমন একটি অধ্যায় যা আমাকে আনন্দ যেমন দিয়েছে, তেমনি ভয়ও দিয়েছে।
কিন্তু সেই ভয় ভালোবাসাটাকে মিথ্যা করে দেয়নি।
আমি আশিককে ভালোবেসেছি। সেই সত্যের জন্য আমি লজ্জিত নই।
আমার পরিচয় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কার?
আমার পরিচয় কি প্রতিবেশী নির্ধারণ করবেন?
কোনো ধর্মীয় নেতা?
কোনো রাজনৈতিক সংগঠন?
আমার আত্মীয়?
নাকি আমি নিজে?
আমার মতে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ব্যক্তিগত পরিচয়ের ওপর প্রথম অধিকার সেই ব্যক্তির।
সমাজের মূল্যবোধ থাকবে।
ধর্মীয় নৈতিকতা থাকবে।
আইন থাকবে।
কিন্তু মানুষের ব্যক্তিগত সত্তারও একটি সীমারেখা থাকতে হবে।
আমি কাকে ভালোবাসি, সেই প্রশ্নের উত্তর আমাকে দিতে হবে।
অন্য কেউ আমার হয়ে সেটি নির্ধারণ করতে পারে না।
একইভাবে কেউ নিজের ধর্মীয় বিশ্বাস আমার ওপর চাপিয়ে দিলে সহাবস্থান অসম্ভব হয়ে পড়ে।
আমাদের একমত হওয়ার প্রয়োজন নেই।
শুধু একে অপরের ব্যক্তিগত সীমারেখা স্বীকার করার প্রয়োজন আছে।
আমার জীবন সম্পর্কে আপনার মত থাকতে পারে। কিন্তু আমার পরিচয়ের মালিকানা আপনার নয়।
সমকামী অধিকার মানে কি বিশেষ সুবিধা?
সমকামী মানুষের অধিকারের কথা বললেই কেউ কেউ মনে করেন বিশেষ সুবিধা চাওয়া হচ্ছে।
আমি বিশেষ সুবিধা চাই না।
আমি এমন কোনো অধিকারও চাই না যা অন্য মানুষের নেই।
আমি চাই রাস্তায় নিরাপদে চলতে।
আমি চাই হুমকি পেলে অভিযোগ করতে।
আমি চাই আমার পরিবারের নিরাপত্তা।
আমি চাই ব্যক্তিগত সম্পর্কের গোপনীয়তা।
আমি চাই নিজের মত প্রকাশ করতে।
আমি চাই আমার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে ন্যায়সংগত আইনি প্রক্রিয়া।
এসব কি বিশেষ সুবিধা?
না।
এগুলো এমন অধিকার যা প্রত্যেক মানুষের থাকা উচিত।
সমতার অর্থ কাউকে অন্যের ওপরে তুলে দেওয়া নয়।
সমতার অর্থ একই মানবিক মর্যাদায় সবাইকে দেখা।
তাই সমকামী মানুষের অধিকার নিয়ে কথা বলা কোনো বিশেষ সুবিধার আন্দোলন নয়।
এটি সমান মর্যাদার দাবি।