মৌলবাদী চক্রগুলোর একটি পুরনো কৌশল হলো ধর্মকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করা, যাতে তাদের নিজেদের স্বার্থ, লালসা ও ক্ষমতালিপ্সার বৈধতা তৈরি হয়। সাম্প্রতিক সময়ে তারা আবার মুখর হয়েছে—“অনেকগুলো বিবাহ করা নাকি সওয়াবের কাজ”, “বহু বিবাহ করা ধর্মীয় দায়িত্ব”, ইত্যাদি কথাবার্তা প্রচার করে। অথচ সত্য হলো, ধর্মসহ মানবসভ্যতার কোনো মূল্যবোধই দায়িত্বহীন বহু বিবাহকে পুরস্কৃত করে না। বরং এই প্রবণতা সমাজ, পরিবার ও নারীর মানবাধিকারের ওপর সরাসরি আঘাত।
১. ধর্মকে ঢাল বানিয়ে ব্যক্তিগত লালসা পূরণের প্রয়াস
ধর্মে বহু বিবাহের প্রসঙ্গ এসেছে কঠোর শর্তসাপেক্ষে, দায়িত্ব, ন্যায় ও নৈতিকতার প্রশ্নে। সেখানে “লালসা” নয়, বরং “ন্যায় ও দায়িত্ব পালনের ক্ষমতা” মুখ্য। কিন্তু মৌলবাদীরা সর্বদা শর্ত বাদ দিয়ে কেবল সুযোগের জায়গাটি তুলে ধরে। যেন নারীর কোনো অনুভূতি নেই, তার সম্মতি বা মানবিকতা নেই—শুধু পুরুষের ইচ্ছাই সেখানে একমাত্র বিধান।
এই ধরণের ব্যাখ্যা ধর্মের চেতনাকে বিকৃত করে, ধর্মকে মানুষের নৈতিক উন্নতির পথ থেকে সরিয়ে পুরুষতান্ত্রিক আনন্দভোগের বৈধতা তৈরির হাতিয়ার বানায়।
২. সামাজিক বাস্তবতা: বহু বিবাহ মানেই অস্থিরতা ও অবিচার
বহু বিবাহ কোনো রোমান্টিক বা ‘সওয়াবের’ কর্ম নয়—এটি একটি কঠিন সামাজিক বাস্তবতা সৃষ্টি করে।
পরিবারে আর্থিক চাপ বাড়ে
স্ত্রীরা মানসিক নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে
সন্তানরা বিভাজিত হয়ে পড়ে
দাম্পত্যে স্থিতি ও সহমর্মিতা নষ্ট হয়
যে সমাজে একটি পরিবারই টিকিয়ে রাখা কঠিন, সেখানে বহু পরিবার চালানোর দাবি নিছক মুখের বুলি।
৩. নারীর সম্মানবোধে আঘাত
মৌলবাদীরা বহু বিবাহের যুক্তি দাঁড় করাতে গিয়ে নারীর অবস্থানকে এমন এক নিচু স্তরে নামিয়ে আনে, যেন তিনি কেবল পুরুষের ‘ধর্মীয় অর্জন’-এর উপায়। এই চিন্তাধারা নারীর প্রতি ভয়ঙ্কর অসম্মানজনক।
ধর্মে নারীকে মর্যাদাহীন দেখানোর কোনো নির্দেশ নেই—বরং রয়েছে সমতা, সম্মান, ন্যায় ও সদ্ব্যবহারের শিক্ষা।
যে ব্যাখ্যা নারীকে মানুষ নয়, বরং পুরুষের “সওয়াব অর্জনের মাধ্যম” বানানোর চেষ্টা করে, সেটির কোনো ধর্মীয় ভিত্তি নেই—এটি নিছক মৌলবাদী মনস্তত্ত্ব।
৪. ‘সওয়াব’ আসে দায়িত্ব থেকে, ভোগবিলাস থেকে নয়
ধর্মে সওয়াব মূলত আসে—
ন্যায়বিচার করতে পারা
পরিবারকে সুরক্ষিত রাখা
অসহায়কে সাহায্য করা
সততা, সহমর্মিতা ও নৈতিকতার চর্চা
এখানে কোথাও “বহু বিবাহ করো, তাহলেই সওয়াব”—এমন কথা নেই।
বরং বলা আছে—যদি তুমি একাধিক স্ত্রীকে সমান ন্যায় করতে না পারো, তবে একটিই যথেষ্ট।
অতএব, বহু বিবাহ সওয়াবের কাজ—এই দাবিটি শুধু ভুল নয়, বরং ধর্মবিরোধী।
৫. সমাজকে স্থিতিশীল রাখতে প্রয়োজন যুক্তিবাদী ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি
যে সমাজে শিক্ষা, নারী অধিকার, কর্মসংস্থান, মানবিকতা—এসব বিষয়ে সচেতনতা বাড়ে, সেখানে মৌলবাদীরা টেকেনা।
কারণ প্রশ্ন করতে শেখা মানুষ আর অন্ধভাবে কোনো ‘সওয়াবের’ গল্পে বিশ্বাস করে না।
উপসংহার
বহু বিবাহকে সওয়াবের কাজ বলে প্রচার করা আসলে ধর্মের নামে প্রতারণা। এটি নারীকে অবমাননা করে, পরিবারকে অস্থির করে এবং সমাজে বিভেদ সৃষ্টি করে।
ধর্ম কখনোই অযৌক্তিক ইচ্ছা বা ভোগবিলাসকে উৎসাহ দেয় না—বরং দায়িত্ব, মানবিকতা ও নৈতিকতার পথ দেখায়।
অতএব আমাদের দায়িত্ব হলো—
ধর্মকে মৌলবাদীদের হাত থেকে রক্ষা করা, নারীর মর্যাদাকে অক্ষুণ্ন রাখা এবং যুক্তিবাদী সমাজ গড়ে তোলা।