ভালোবাসা, গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা
ভালোবাসতে হলে কেন আমাকে লুকিয়ে থাকতে হবে?
আমি অনেকবার নিজেকে এই প্রশ্ন করেছি।
আমি যাকে ভালোবাসি, তার সঙ্গে দেখা করার আগে কেন আমাকে চারদিকে তাকাতে হবে?
কেউ দেখছে কি না, কেউ অনুসরণ করছে কি না, পরিচিত কেউ আছে কি না, এসব চিন্তা কেন ভালোবাসার সঙ্গে যুক্ত হবে?
একজন ছেলে ও একটি মেয়ে একসঙ্গে হাঁটলে আমরা সাধারণত তাদের পেছনে অনুসরণ করে জানতে চাই না তাদের মধ্যে কী সম্পর্ক।
কিন্তু দুটি পুরুষের ঘনিষ্ঠতা দেখলে কেন এত মানুষের কৌতূহল তৈরি হয়?
আমার এবং আশিকের সম্পর্ক আমাদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক।
আমরা দুজনই মানুষ।
আমাদের ভালোবাসার মধ্যেও ছিল অপেক্ষা, অভিমান, আনন্দ এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন।
কিন্তু এর সঙ্গে সবসময় একটি অতিরিক্ত অনুভূতি ছিল।
ভয়।
আমি এমন একটি পৃথিবী চাই যেখানে একজন সমকামী মানুষকে ভালোবাসার আগে নিরাপত্তার হিসাব করতে হবে না।
কারণ ভালোবাসা যদি সবসময় লুকিয়ে রাখতে হয়, তাহলে স্বাধীনতার অর্থটাই অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
আমার ব্যক্তিগত জীবন কি জনতার সম্পত্তি?
একজন মানুষ সমকামী হলেই কি তার ব্যক্তিগত জীবন আর ব্যক্তিগত থাকে না?
এই প্রশ্ন আমার কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আমার সম্পর্ক কার সঙ্গে, আমি কার প্রতি আকৃষ্ট, কার সঙ্গে সময় কাটাই, এগুলো আমার ব্যক্তিগত জীবনের অংশ।
কিন্তু সমকামী মানুষের ক্ষেত্রে সমাজের একটি অংশ যেন মনে করে এসব জানার অধিকার সবার আছে।
কেউ প্রশ্ন করবে।
কেউ অনুসরণ করবে।
কেউ ছবি তুলবে।
কেউ ব্যক্তিগত বিষয় অন্য মানুষের কাছে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবে।
কিন্তু কেন?
গোপনীয়তার অধিকার শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জন্য হতে পারে না।
আমি সমকামী হলেও আমার ব্যক্তিগত মুহূর্তের মালিক আমি।
আমার অনুমতি ছাড়া আমার ব্যক্তিগত জীবনকে জনসমক্ষে নিয়ে আসার নৈতিক অধিকার কারও নেই।
একজন মানুষের পরিচয় যত অজনপ্রিয়ই হোক, তার ব্যক্তিগত মর্যাদা শেষ হয়ে যায় না।
সমকামী মানুষেরও একটি দরজা আছে। সেই দরজার ওপাশে তার ব্যক্তিগত জীবন। সেখানে প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার অধিকার তার নিজের।
একটি ছবি যখন স্মৃতি নয়, আতঙ্ক হয়ে ওঠে
ছবি সাধারণত সুন্দর মুহূর্ত ধরে রাখে।
কিন্তু ব্যক্তিগত মুহূর্তের ছবি যদি সংশ্লিষ্ট মানুষের অনুমতি ছাড়া ধারণ করা হয়, তখন ছবির অর্থ সম্পূর্ণ বদলে যেতে পারে।
বিশেষ করে এমন একজন মানুষের জন্য, যার যৌন পরিচয় প্রকাশ হয়ে যাওয়া তার নিরাপত্তা নিয়ে ভয় তৈরি করতে পারে।
আমার নিজের অভিজ্ঞতার বর্ণনায় ২ জুনের ঘটনাটি এই কারণেই এত গুরুত্বপূর্ণ।
আমার এবং আমার সঙ্গীর ব্যক্তিগত মুহূর্তের ছবি ও ভিডিও ধারণ করা হয়েছিল বলে আমি বর্ণনা করেছি।
সেই মুহূর্তে আমার প্রথম অনুভূতি ছিল ভয়।
কে দেখবে?
কোথায় যাবে?
আমাদের পরিবারের কী হবে?
ব্যক্তিগত গোপনীয়তা কোনো বিলাসিতা নয়।
সমকামী মানুষের ক্ষেত্রেও নয়।
কারও পরিচয়কে তার বিরুদ্ধে অস্ত্র বানানোর সংস্কৃতি বন্ধ হওয়া প্রয়োজন।
নিজের পরিচয় অস্বীকার করে কি নিরাপদ হওয়া যায়?
অনেকে বলেন, পরিচয় গোপন রাখলেই তো সমস্যা নেই।
কথাটি শুনতে সহজ।
বাস্তবে এর অর্থ অনেক কঠিন।
নিজেকে প্রতিদিন অস্বীকার করা।
ভালোবাসার মানুষকে অন্য পরিচয়ে পরিচয় করিয়ে দেওয়া।
কথা বলার আগে চিন্তা করা।
ছবি তোলার আগে ভয় পাওয়া।
পরিবারের সামনে এক জীবন এবং বাইরের পৃথিবীতে আরেক জীবন যাপন করা।
এভাবে একজন মানুষ হয়তো কিছু বিপদ এড়িয়ে চলতে পারেন।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এটাকে কি স্বাধীন জীবন বলা যায়?
আমি মনে করি নিরাপত্তার সমাধান হওয়া উচিত সহিংসতা বন্ধ করা।
ভুক্তভোগীকে অদৃশ্য হয়ে যেতে বলা নয়।
“নিজেকে লুকিয়ে রাখো, তাহলে নিরাপদ থাকবে” কোনো ন্যায়সংগত সামাজিক সমাধান হতে পারে না।