ভাস্কর্য–ভীতুদের গল্প: পাথর নয়, ভয়ই তাদের শত্রু

একটা কথা খেয়াল করেছ?
পাথর তো চুপ করে থাকে।
কেউ কাঁদে না, হাসে না, ডাকেও না।
রাস্তার মোড়ের ভাস্কর্যটা সারাদিন সূর্য দেখে, সন্ধ্যায় বাতি দেখে, আর মাঝেমধ্যে মানুষের ব্যস্ত মুখ দেখে।
কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার হলো—
এই নির্বাক পাথরের চেয়ে তাকে ভয় পায় জীবন্ত মানুষই।
বিশেষ করে সেই মানুষগুলো,
যাদের হাতে ধর্মের পতাকা,
কিন্তু মাথার ভেতর পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শুন্যতা।
—
**একটা ভাস্কর্য নাকি হারাম!
হারাম? নাকি ওদের বুকের সাহসটাই হারাম হয়ে গেছে?**
মনে হয় ভাস্কর্যটা কোনো গুপ্তচর।
ওরা ভাবছে—পাথরের চোখ দিয়ে কেউ তাদের দেখে ফেলবে,
তাদের অজ্ঞানতা, তাদের ভয়, তাদের মুখোশ—সবটাই প্রকাশ হয়ে যাবে।
তাই তারা চায় চোখ-কান বন্ধ করে রাখতে;
যা বোঝে না, সেটাই নাকি “হারাম”।
যে ভাষা পড়ে না, সেটাই নাকি “ভুল ব্যাখ্যা”।
যে শিল্প অনুভব করতে পারে না, সেটাই নাকি “অপবিত্র”।
এ যেন জ্ঞানহীনতার রাজ্যে জ্ঞানই অপরাধ!
—
ভাস্কর্য ভাঙার দাবি নয়—এটি স্মৃতি হত্যার চেষ্টামাত্র
তাদের সমস্যা ভাস্কর্যের সাথে নয়;
তাদের সমস্যা সেই গল্পের সাথে
যে গল্প ভাস্কর্যের চেহারায় জমে আছে।
তারা জানে—
ভাষা আন্দোলনকে যত মুছতে চাওয়া যায়,
শহিদ মিনার তত শক্ত হয়ে দাঁড়ায়।
মুক্তিযুদ্ধকে যত ভুলিয়ে দিতে চাওয়া যায়,
বীরদের ভাস্কর্য তত দৃঢ় হয়ে ওঠে।
তাই তারা পাথর ভাঙতে আসে—
ভুলে যায়, পাথর ভাঙা যায়,
কিন্তু ইতিহাস ভাঙা যায় না।
—
মূর্তির ভয় দেখিয়ে ভাস্কর্য দমন—এ পুরনো কৌশল
ধর্মে যা নিষিদ্ধ, সেটাকে সামনে এনে
শিল্পকে দোষী বানানো—
এটা মৌলবাদীদের আদিম কৌশল।
তারা বলে—মূর্তি আর ভাস্কর্য একই!
সেই যুক্তিতে তো মেঘ আর তুলাও একই,
কারণ দুটোই নরম।
ধর্ম কখনো শিল্পকে শত্রু বলেনি।
মৌলবাদীরা বলেছে।
কারণ শিল্প স্বাধীনতা শেখায়, আর স্বাধীন মানুষ তাদের কথা অন্ধভাবে শোনে না।
—
**মৌলবাদীরা ভাস্কর্যকে ভয় পায় না—
ভয় পায় সাহসকে,
যা ভাস্কর্যের চেহারায় খোদাই করা থাকে।**
প্রতিটি ভাস্কর্য একেকটি ঘোষণা—
“এই দেশের মানুষ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে।”
আর যারা মানুষের মাথা নিচু রাখতে চায়,
তারা এমন ঘোষণা কখনো সহ্য করতে পারে না।
তাই তারা এসে বলে—
ভাস্কর্য হারাম!
শিল্প হারাম!
ইতিহাস হারাম!
কিন্তু সত্যি কথা হলো—
হারাম শুধু একটাই বিষয়: ভয়কে ধর্ম বানানো।
—
শেষ কথা: ভাস্কর্য দাঁড়িয়ে থাকে, ভয় ভেঙে যায়
পাথরের শরীর ভাঙলে মনে করেছিলো—ইতিহাস ভেঙে যাবে।
কিন্তু ইতিহাস তো মাটিতে পড়ে থাকা ধুলোও নয়,
যা ইচ্ছে করলে উড়িয়ে দেওয়া যায়।
ইতিহাস বুকের ভিতর থাকে।
চিন্তায় থাকে।
সংস্কৃতির শিরায় শিরায় থাকে।
তাই ভাস্কর্য ভাঙলেও
মানুষ থামে না—
কারণ মানুষ জানে:
যে ভয় দেখায়, সে-ই সবচেয়ে ভয় পায়।