অন্ধকারের বিরুদ্ধে এই লড়াই এখন আমাদের সবার**
বাংলাদেশে নাচ–গান নিষিদ্ধ করার নতুন শোরগোল কিছু না—এটা পুরনো মদ, শুধু বোতলটা বদলেছে। কিন্তু যখন দেখছি সুনামগঞ্জে জামায়াত ও হেফাজত আবারও ফতোয়া–বাজি শুরু করেছে, তখন সত্যিই মনে হয়—এরা কি এখনো ভাবে পুরো দেশটাকে নিজেদের মুঠোয় ধরে রাখবে?
নাচ–গান বন্ধ করে দিলে সমাজ নষ্ট হয়ে যাবে—এমন আজগুবি যুক্তি দিয়ে এরা আসলে আরেকটা কাজই করে থাকে:
মানুষকে ভয় দেখানো, স্বাধীনতা থেঁতলে দেওয়া, আর নিজেদের অন্ধকার রাজনীতি বসানো।
—
১. কেন সুনামগঞ্জ? কারণ এই অঞ্চলের সংস্কৃতি মৌলবাদীদের স্বপ্নের ঠিক বিপরীত
সুনামগঞ্জ মানেই বাউলদের ঘর, হাওরের গান, লোকনৃত্য, উৎসব আর মানুষের অবাধ মেলামেশা।
এই রঙিন সংস্কৃতির মাঝেই জামায়াত–হেফাজতের গায়ে যেন আগুন ধরে।
কারণ তারা চায়—
প্রশ্নহীন সমাজ
আনন্দহীন মানুষ
ভয়ে চুপ থাকা জনগণ
কিন্তু সুনামগঞ্জের মানুষ তো উল্টো—
ওরা গান গায়, নাচে, হাসে, উৎসব করে।
এই স্বাধীনতাই মৌলবাদীদের গলায় কাঁটার মতো লাগে।
—
২. সমস্যা নাচ–গানে নয়—সমস্যা নারীর স্বাধীনতায়
হেফাজত–জামায়াত খোলাখুলিই দেখিয়ে দিয়েছে:
নারী যখন মঞ্চে উঠে দাঁড়ায়, তখনই তাদের ঈমান নড়ে ওঠে।
নারী গান গাইছে—অশান্তি।
নারী নাচছে—ধর্মবিরোধিতা।
নারী জনসমক্ষে—সমাজ নষ্ট।
আসলে নারীর স্বাধীন উপস্থিতিই এদের কাছে হুমকি।
কারণ নারী স্বাধীন হলেই পুরুষতান্ত্রিক শাসন ভেঙে যায়।
এই ভাঙন এদের ভয় দেখায়। তাই ধর্মের নামে নারীর ওপর নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে নিজেদের ক্ষমতা জিইয়ে রাখতে চায়।
—
৩. ফতোয়ার পেছনের আসল খেলা: সমাজকে কুয়াশায় ঢেকে রাখা
ফতোয়া মানে ভয়।
ফতোয়া মানে মানুষকে বিভ্রান্ত করে মানসিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা।
জামায়াত–হেফাজত এই অস্ত্রটাই ব্যবহার করে।
তারা জানে—সচেতন, শিল্প–সচেতন মানুষ কখনও মৌলবাদী রাজনীতিকে দম মাথায় নেবে না।
তাই নাচ–গান, মঞ্চ, উৎসব—সবকিছুর ওপর আঘাত হানে।
একটা কথা ভুলে গেলে চলবে না—
যারা শিল্পকে ভয় পায়, তারা মানুষের স্বাধীনতাকেই ভয় পায়।
—
৪. সুনামগঞ্জে যেভাবে ফতোয়ার নামে সাংস্কৃতিক দমন চাপানো হয়
অনুষ্ঠান বন্ধ করার হুমকি
মঞ্চ ভাঙচুর
শিল্পীদের ভয় দেখানো
লোকজনকে ধর্মের নামে বিভ্রান্ত করা
যেন সুনামগঞ্জ তাদের একচ্ছত্র জমিদারি!
কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না—
এদেশের মানুষ জামায়াত–হেফাজতের দাস নয়।
সংবিধান, আইন, সংস্কৃতি—সবই মানুষের অধিকার, মৌলবাদীদের করুণায় পাওয়া ভিক্ষা নয়।
—
৫. নাচ–গান নিষিদ্ধ করার ডাক বাংলাদেশের মূল চেতনাকে আঘাত করে
বাংলাদেশ জন্ম নিয়েছে মুক্তির সংগ্রামে; অন্ধকারে নয়, আলোয় দাঁড়িয়ে।
এদেশের মুক্তিযুদ্ধ, কবিতা, গান—সবই আমাদের আত্মার অংশ।
তাই নাচ–গান বন্ধ করার ফতোয়া মানে বাংলাদেশের ইতিহাসে ছুরি মারা।
আর আমরা যারা সুনামগঞ্জ, সিলেট, ঢাকা, খুলনা—যেখানেই থাকি না কেন—
এই ছুরি মেনে নেওয়া মানে আমাদের ভবিষ্যৎকে অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া।
—
শেষ কথা: সুনামগঞ্জকে বাঁচাতে হলে সংস্কৃতি বাঁচাতে হবে
জামায়াত–হেফাজতের অন্ধকার রাজনীতি থামাতে হলে আমাদের স্পষ্ট হতে হবে:
নাচ–গান অপরাধ নয়।
ফতোয়াবাজি অপরাধ।
যে দেশ বাউল–রবীন্দ্রনাথ–লালনের, সেই দেশে সংস্কৃতিকে ‘হারাম’ বলে বন্ধ করতে চাওয়া একটাই জিনিস প্রমাণ করে—
অন্ধকার তার শেষ লড়াই করছে।
আর আমরা এই লড়াইয়ে পিছিয়ে থাকব কেন?
এই দেশ সবার—মৌলবাদীদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়।
সুনামগঞ্জের সংস্কৃতির ওপর আক্রমণ মানে পুরো বাংলাদেশের ওপর আক্রমণ।
এটাকে রুখতে হবে—এখনই, একসাথে, স্পষ্ট কণ্ঠে।
—