কিছু মানুষ জীবনে আসে খুব সাধারণভাবে, কিন্তু একসময় সেই মানুষটিই হয়ে ওঠে জীবনের সবচেয়ে অসাধারণ অধ্যায়। আমার জীবনে আশিক ঠিক তেমনই একজন।
২০২৩ সালে আশিকের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা যখন গভীর হতে শুরু করে, তখন হয়তো আমরা কেউই জানতাম না এই সম্পর্ক আমাকে এতটা বদলে দেবে। তার সঙ্গে কথা বলা, দেখা হওয়ার অপেক্ষা করা, ছোট ছোট বিষয় নিয়ে অভিমান করা, আবার কিছুক্ষণ পর সব ভুলে যাওয়া, এসবের মধ্যেই ধীরে ধীরে সে আমার জীবনের খুব আপন একজন হয়ে ওঠে।
আমি একজন পুরুষ, আশিকও একজন পুরুষ। আমাদের ভালোবাসাটা তাই অনেকের চোখে হয়তো প্রচলিত কোনো প্রেমের গল্প নয়। কিন্তু আমার কাছে ভালোবাসার অনুভূতিটা অন্য যেকোনো মানুষের মতোই ছিল।
আশিকের সঙ্গে দেখা হওয়ার আগে কতবার যে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে ঠিক করেছি, তার হিসাব নেই। অথচ দেখা হওয়ার পর সে আমার পোশাকের দিকে তাকাল কি না, চুল ঠিক আছে কি না, এসব আর মনেই থাকত না। তখন শুধু মনে হতো, মানুষটা আমার সামনে আছে, এটাই যথেষ্ট।
আমাদের সম্পর্কের সবচেয়ে কষ্টের জায়গাটি ছিল গোপনীয়তা।
ইচ্ছে করত তার পাশে স্বাভাবিকভাবে হাঁটি। কোনো পরিচিত মানুষ সামনে পড়লে ভয় না পাই। ইচ্ছে করত অন্য দশজন প্রেমিক-প্রেমিকার মতো আমরা একসঙ্গে বসে গল্প করি, ছবি তুলি, হাসি। ভালোবাসার মানুষটির পাশে দাঁড়ানোর আগে চারদিকে তাকিয়ে নিশ্চিত হতে না হয় যে কেউ আমাদের দেখছে কি না।
কখনো কখনো আশিককে বলতাম, “এভাবে আর কতদিন?”
সে হয়তো হেসে কথাটা এড়িয়ে যেত। কিন্তু তার চোখের দিকে তাকালে বুঝতাম, প্রশ্নটা শুধু আমার নয়। তার মনেও একই প্রশ্ন ছিল।
আমাদের অনেক স্মৃতি খুব সাধারণ। দীর্ঘ সময় কথা বলা, একে অপরের অপেক্ষায় থাকা, ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখা। অথচ আজ সেই সাধারণ স্মৃতিগুলোই আমার কাছে অসাধারণ মূল্যবান।
আশিকের সঙ্গে থাকলে আমি নিজেকে লুকাতে চাইতাম না। তার সামনে আমাকে অন্য কারও অভিনয় করতে হতো না। আমি যেমন, ঠিক তেমনভাবেই সে আমাকে চিনেছিল।
ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর দিক সম্ভবত এটাই। একজন মানুষ যখন আপনার পরিচয় জানার পরও আপনাকে বদলে দিতে চায় না, বরং আপনার সত্যিকারের সত্তাটাকেই আপন করে নেয়।
আমাদের ভবিষ্যৎ কেমন হবে, আমরা তখন জানতাম না। শুধু এটুকু জানতাম, একে অপরের প্রতি আমাদের অনুভূতিটা সত্যি।
আজ আশিকের কথা মনে পড়লে অনেক স্মৃতি একসঙ্গে ফিরে আসে। কিছু স্মৃতি আমাকে হাসায়, কিছু স্মৃতি চোখ ভিজিয়ে দেয়। মাঝে মাঝে মনে হয়, যদি পৃথিবীটা একটু অন্যরকম হতো! যদি আমাদের ভালোবাসাকে লুকিয়ে রাখতে না হতো! যদি ভালোবাসার আগে আমাদের ভাবতে না হতো আমরা দুজন পুরুষ!
তবুও আমি আমাদের সম্পর্ক নিয়ে লজ্জিত নই।
কারণ আশিককে ভালোবাসার মধ্য দিয়ে আমি বুঝেছি, ভালোবাসার মূল্য মানুষের লিঙ্গ দিয়ে নির্ধারিত হয় না। ভালোবাসা মানে কারও জন্য অপেক্ষা করা, তার হাসিতে নিজের আনন্দ খুঁজে পাওয়া, তার কষ্টে নিজের বুক ভারী হয়ে আসা এবং হাজার অনিশ্চয়তার মধ্যেও মানুষটিকে নিজের জীবনে চাওয়া।
আশিক আমার জীবনের শুধু একটি নাম নয়।
সে আমার জীবনের এমন একটি অধ্যায়, যেখানে আমি প্রথমবার আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করেছি, নিজের সত্যিকারের পরিচয় নিয়ে কাউকে ভালোবাসতে পারাটাও এক ধরনের স্বাধীনতা।
আমাদের গল্প হয়তো সহজ ছিল না। হয়তো পৃথিবী আমাদের জন্য সহজ কোনো পথও তৈরি করে রাখেনি।
কিন্তু ভালোবাসাটা সত্যি ছিল।
আর কিছু সত্যকে লুকিয়ে রাখা যায়, কিন্তু মুছে ফেলা যায় না।