কিছুদিন আগেও আমি লিখেছিলাম, “অস্তিত্বের অধিকার বনাম ঘৃণা: সমকামী জীবনে কি নিরাপত্তার কোনো স্থান নেই?”
তারপর ২ ও ৩ জুনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পর লিখেছিলাম, “ভালোবাসার মূল্য কি জীবন দিয়ে দিতে হবে?”
আমি ভেবেছিলাম, হয়তো এর চেয়ে ভয়াবহ প্রশ্ন আর আমাকে লিখতে হবে না।
আমি ভুল ছিলাম।
১৭ জুন ২০২৬।
এই তারিখটি আমার কাছে শুধু ক্যালেন্ডারের একটি দিন নয়। এটি এমন একটি দিনের স্মৃতি, যেদিন আমার পরিচয়ের কারণে আবার আমার পরিবারের ওপর আঘাত নেমে আসে।
আমার বর্ণনা অনুযায়ী, সেদিন আবার আমাদের বাড়িতে হামলা চালানো হয়। ঘরবাড়ি ভাঙচুর করা হয়। আমার বাবা-মা আহত হন।
আর হামলার সময় প্রকাশ্যে বলা হয়, আমি সমকামী, তাই আমাদের বাড়িতে হামলা করা এবং আমাকে হত্যা করা তাদের ভাষায় “জিহাদের সমান”।
এই কথাটি লেখার সময়ও আমার হাত কাঁপে।
আমি সমকামী।
কিন্তু তার জন্য আমার বাবা-মাকে কেন আঘাত সহ্য করতে হবে?
আমার পরিচয়ের শাস্তি আমার বাবা-মা কেন পাবেন?
আমার বাবা সমকামী নন।
আমার মা সমকামী নন।
আমার ব্লগের লেখাগুলোও তারা লেখেননি।
আমি কী লিখব, কাকে ভালোবাসব, নিজের পরিচয় সম্পর্কে কী বলব, সেই সিদ্ধান্তগুলো আমার।
তাহলে আমার সিদ্ধান্তের কারণে আমার বাবা-মায়ের শরীরে আঘাত আসবে কেন?
আমাদের ঘরবাড়ি ভাঙচুর হবে কেন?
একজন সন্তানের যৌন অভিমুখিতার জন্য তার বৃদ্ধ বাবা-মাকে আক্রমণ করার মধ্যে কোন ন্যায়বিচার থাকতে পারে?
আমি এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাই না।
আমি শুধু ভাবি, আমার জন্মের পর যে মানুষ দুটি আমাকে কোলে নিয়েছিলেন, আমাকে বড় করেছেন, আমার অসুস্থতায় রাত জেগেছেন, আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখেছেন, শেষ পর্যন্ত আমার পরিচয়ের জন্য সেই মানুষগুলোকেই কেন মূল্য দিতে হবে?
একজন সন্তানের জন্য এর চেয়ে অসহায় অনুভূতি আর কী হতে পারে?
যে বাড়িটিকে নিরাপদ মনে করতাম
বাড়ি শব্দটির সঙ্গে আমাদের নিরাপত্তার অনুভূতি জড়িয়ে থাকে।
বাইরের পৃথিবী যত কঠিনই হোক, মানুষ ভাবে অন্তত নিজের বাড়ির দরজা বন্ধ করলে সে নিরাপদ।
আমার ক্ষেত্রেও বাড়ি ছিল সেই জায়গা।
সেখানে আমার শৈশব ছিল।
আমার বাবা-মা ছিলেন।
আমার পরিচিত ঘর, পরিচিত উঠান, পরিচিত স্মৃতি ছিল।
কিন্তু যখন সেই বাড়িতেই বারবার হামলা হয়, তখন বাড়ি আর আশ্রয় থাকে না।
বাড়িটাও ভয়ের জায়গায় পরিণত হয়।
একটি পরিবার নিজের ঘরের মধ্যেও যদি নিরাপত্তা অনুভব করতে না পারে, তাহলে তারা কোথায় যাবে?
৩ জুনের পরও ঘৃণা থামেনি
৩ জুনের ঘটনার পর আমাদের পরিবার এমনিতেই আতঙ্কের মধ্যে ছিল।
আমি ভেবেছিলাম, এর পর হয়তো পরিস্থিতি শান্ত হবে।
কিন্তু ১৭ জুনের ঘটনা আমাকে বুঝিয়ে দিল, বিষয়টি কোনো এক দিনের ক্ষোভের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
আমার যৌন পরিচয় এবং আমার লেখালেখি ঘিরে তৈরি হওয়া ঘৃণা আমার পরিবারকেও নিরাপত্তাহীন করে তুলেছে।
আমার সবচেয়ে বড় ভয় তখন নিজের জন্য ছিল না।
বাবা-মায়ের জন্য ছিল।
কারণ আমি যদি নিজের নিরাপত্তার জন্য কোথাও লুকিয়েও থাকি, আমার বাবা-মা কী করবেন?
তাদের কি নিজেদের বাড়ি ছেড়ে পালাতে হবে?
একজন সন্তানের পরিচয়ের কারণে একটি পুরো পরিবারকে কি ঘরছাড়া হতে হবে?
“জিহাদ” শব্দটি শুনে আমার প্রশ্ন
ধর্ম নিয়ে আমি তর্ক করতে চাই না।
আমি কোনো মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস কেড়ে নিতে চাই না।
আমি আগেও বলেছি, একজন ধর্মপ্রাণ মানুষ সমকামিতাকে ধর্মীয়ভাবে নিষিদ্ধ মনে করতে পারেন। তিনি আমার জীবনযাপনকে সমর্থন না-ও করতে পারেন।
কিন্তু আমার প্রশ্ন অন্য জায়গায়।
আমার বর্ণনা অনুযায়ী, যারা আমাদের বাড়িতে হামলা করেছিল তারা আমার সমকামী পরিচয়ের কথা উল্লেখ করে এই হামলা ও আমাকে হত্যাকে তাদের ভাষায় “জিহাদের সমান” বলেছিল।
আমি জানতে চাই, কোনো ধর্মীয় শব্দ উচ্চারণ করলেই কি একজন মানুষের বিরুদ্ধে সহিংসতা বৈধ হয়ে যায়?
একজন নিরস্ত্র বাবা-মায়ের ওপর আঘাত কি ধর্ম রক্ষার কাজ?
একটি পরিবারের ঘরবাড়ি ভাঙচুর করলে কোন বিশ্বাস রক্ষা পায়?
আমি ধর্মের বিরুদ্ধে নই।
আমি সহিংসতার বিরুদ্ধে।
ধর্মীয় বিশ্বাস এবং ধর্মের নামে সহিংসতাকে এক করে দেখা উচিত নয়।
আমি কি এত বড় অপরাধ করেছি?
আমি নিজেকে বারবার প্রশ্ন করি।
আমি কী করেছি?
আমি একজন পুরুষ হয়ে একজন পুরুষকে ভালোবেসেছি।
আমি সমকামী মানুষের নিরাপত্তার কথা লিখেছি।
আমি বলেছি, হুমকি দিয়ে মানুষের মুখ বন্ধ করা উচিত নয়।
আমি বলেছি, একজন সমকামী মানুষেরও বেঁচে থাকার অধিকার আছে।
এগুলো বলার জন্য কি আমাকে হত্যা করার কথা বলা হবে?
আমার বাবা-মাকে আঘাত করা হবে?
আমাদের বাড়ি ভাঙচুর করা হবে?
যদি একটি মতের জবাব যুক্তি দিয়ে দেওয়া না যায় এবং তার পরিবর্তে একটি পরিবারের ওপর হামলা করা হয়, তাহলে সেটি আর মতের লড়াই থাকে না।
সেটি ভয় সৃষ্টি করার চেষ্টা হয়ে দাঁড়ায়।
আমার মায়ের কষ্টের জন্য কে দায় নেবে?
একজন মায়ের কাছে সন্তান সবসময় সন্তান।
সমাজ তার সন্তানকে যে পরিচয়েই ডাকুক না কেন।
আমার মা আমাকে সমকামী পরিচয়ের আগে নিজের সন্তান হিসেবে দেখেন।
আমি যখন ভাবি আমার কারণে আমার মা আহত হয়েছেন, তখন নিজের ভেতরে যে অপরাধবোধ তৈরি হয়, সেটি ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।
আমি জানি, আমার যৌন অভিমুখিতা কোনো অপরাধ নয়।
তারপরও একজন সন্তান হিসেবে মনে হয়, আমি না থাকলে হয়তো বাবা-মাকে এই পরিস্থিতি দেখতে হতো না।
কিন্তু তারপর নিজেকেই প্রশ্ন করি, কেন আমাকে এমন ভাবতে হবে?
অপরাধ যদি আমি না করে থাকি, তাহলে আমাকে নিজের অস্তিত্বের জন্য অপরাধবোধে ভুগতে হবে কেন?
আমার মা কেন তার সন্তানকে ভালোবাসার মূল্য দেবেন?
আমার বাবার সতর্কবাণীগুলো মনে পড়ে
বাবা আমাকে আগে থেকেই সাবধানে থাকতে বলতেন।
তিনি ভয় পেতেন।
আমি অনেক সময় তার ভয় বুঝতে চাইতাম না।
আমার মনে হতো, আমি কার সঙ্গে সম্পর্ক করব, কী লিখব, সেটি তো আমার ব্যক্তিগত স্বাধীনতা।
কেউ আমাকে বাধা দেওয়ার কে?
আজ বুঝতে পারি, বাবার কথাগুলোর পেছনে শুধু সামাজিক ভয় ছিল না।
সন্তানের জীবন নিয়ে একজন বাবার আতঙ্ক ছিল।
তিনি হয়তো এমন একটি বিপদ দেখতে পাচ্ছিলেন, যেটি আমি তখন দেখতে চাইনি।
আর আজ যখন আমার পরিচয়ের কারণে তাকেই আহত হতে হয়েছে, তখন এই বাস্তবতা আমাকে ভেতর থেকে ভেঙে দেয়।
একজন সমকামী মানুষের পরিবারও কি নিরাপত্তা পাবে না?
সমকামী মানুষের অধিকার নিয়ে কথা বলার সময় আমরা সাধারণত সেই ব্যক্তির নিরাপত্তার কথা বলি।
কিন্তু ১৭ জুনের ঘটনা আমার সামনে আরেকটি প্রশ্ন এনেছে।
তার পরিবারের নিরাপত্তা কে নিশ্চিত করবে?
একজন মানুষকে না পেয়ে যদি তার বাবা-মাকে লক্ষ্য করা হয়, তাহলে সেই মানুষটি কোথায় নিরাপদ?
সে কি নিজের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেবে?
বাবা-মায়ের কাছে যাবে না?
নিজের জন্মস্থান ছেড়ে দেবে?
নিজের পরিচয় অস্বীকার করবে?
কোনটি করলে সে নিরাপদ হবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আমার কাছে নেই।
আমার বাবা-মা আমার দুর্বলতা নন
যারা একটি মানুষকে ভয় দেখাতে তার পরিবারকে লক্ষ্য করে, তারা সম্ভবত জানে পরিবারের ওপর আঘাত সবচেয়ে গভীর আঘাতগুলোর একটি।
নিজে আহত হওয়ার যন্ত্রণা হয়তো একজন মানুষ সহ্য করতে পারে।
কিন্তু নিজের কারণে বাবা-মা আহত হয়েছেন, এই অনুভূতি বহন করা অনেক কঠিন।
আমি আমার বাবা-মাকে ভালোবাসি।
তাই তাদের নিয়ে আমার ভয়ও সবচেয়ে বেশি।
কিন্তু এই ভালোবাসাকে আমার বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।
কোনো মানুষের পরিবারকে তার পরিচয় বা মতপ্রকাশের জন্য শাস্তি দেওয়া যায় না।
রাষ্ট্রের কাছে আমার প্রশ্ন
একজন নাগরিক কতবার আক্রান্ত হলে তার ভয়কে বাস্তব বলে বিবেচনা করা হবে?
একটি পরিবার কতবার আতঙ্কের মধ্যে পড়লে তাদের নিরাপত্তার প্রয়োজন স্বীকার করা হবে?
ঘরবাড়ি ভাঙচুর হওয়ার পর?
বাবা-মা আহত হওয়ার পর?
নাকি কারও মৃত্যু হওয়ার পর?
আইনের কাজ শুধু অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর মৃতদেহ গোনা নয়।
আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য মানুষের জীবন রক্ষা করা।
যখন কোনো ব্যক্তি বা পরিবার বারবার হুমকি ও সহিংসতার আশঙ্কার কথা জানায়, তখন সেই ভয়কে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।
কারণ পরবর্তী ঘটনা ঘটার পর অনুশোচনা একজন মানুষের জীবন ফিরিয়ে দিতে পারে না।
আমি বাঁচতে চাই, আমার পরিবারকেও বাঁচতে দিতে হবে
আমার দাবি খুব সাধারণ।
আমি বাঁচতে চাই।
আমার বাবা-মাকে নিরাপদ দেখতে চাই।
আমি চাই আশিক নিরাপদ থাকুক।
আমি চাই একজন সমকামী তরুণ নিজের পরিচয় বুঝতে শুরু করলে প্রথমেই মৃত্যুর ভয় তার মাথায় না আসুক।
আমি চাই কোনো বাবা তার সমকামী সন্তানকে এই বলে সতর্ক করতে বাধ্য না হন যে নিজের পরিচয় প্রকাশ করলে জীবন বিপদে পড়তে পারে।
আমি চাই কোনো মা তার সন্তানের পরিচয়ের কারণে নিজের বাড়িতে হামলার শিকার না হন।
এসব কোনো বিশেষ সুবিধার দাবি নয়।
এগুলো নিরাপদে বেঁচে থাকার দাবি।
আমি এখনও বলছি, ঘৃণার উত্তর ঘৃণা নয়
এত কিছুর পরও আমি কোনো ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়াতে চাই না।
যারা আমার সঙ্গে দ্বিমত করেন, তাদের বিরুদ্ধেও নয়।
কারণ আমি যদি ঘৃণার জবাব ঘৃণা দিয়ে দিই, তাহলে যে সংস্কৃতির বিরুদ্ধে লিখছি আমিও তার অংশ হয়ে যাব।
আমি চাই বিচার।
আমি চাই নিরাপত্তা।
আমি চাই আইনের প্রয়োগ।
আমি চাই একজন মানুষের বিরুদ্ধে সহিংসতার অভিযোগ তার যৌন অভিমুখিতা দেখে নয়, ঘটনার গুরুত্ব দেখে বিবেচিত হোক।
আজ আমার প্রশ্ন আরও কঠিন
প্রথমে আমি লিখেছিলাম:
হুমকি দিয়ে মুখ বন্ধ করা যাবে না।
এরপর লিখেছিলাম:
সমকামী জীবনে কি নিরাপত্তার কোনো স্থান নেই?
তারপর প্রশ্ন করেছিলাম:
ভালোবাসার মূল্য কি জীবন দিয়ে দিতে হবে?
১৭ জুনের পর আমার প্রশ্ন আরও কঠিন:
আমি সমকামী বলে কি আমার বাবা-মাকেও রক্ত দিতে হবে?
আমার পরিচয়ের দায় তাদের নয়।
আমার লেখার দায় তাদের নয়।
আমার সম্পর্কের দায়ও তাদের নয়।
তবু যদি আমার পরিচয়ের কারণে তাদের ওপর আঘাত আসে, তাহলে সমস্যাটি শুধু আমার ব্যক্তিগত নিরাপত্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।
এটি একটি পুরো পরিবারের বেঁচে থাকার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
শেষ কথা
আমার বাড়ি ভাঙা যেতে পারে।
আমাকে ভয় দেখানো যেতে পারে।
আমার বাবা-মাকে আঘাত করে আমাকে মানসিকভাবে ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করা যেতে পারে।
কিন্তু একটি সত্য বদলানো যাবে না।
আমি একজন মানুষ।
আমার বাবা-মাও মানুষ।
আমাদের জীবন ও নিরাপত্তার মূল্য আছে।
আমি সমকামী হওয়ার কারণে আমার মানবিক মর্যাদা কমে যায় না।
আর আমার সন্তান হিসেবে পরিচয়ের কারণে আমার বাবা-মায়ের জীবন ও নিরাপত্তার মূল্যও কমে যায় না।
যারা সমকামিতার বিরোধিতা করতে চান, করুন।
লিখুন।
বক্তব্য দিন।
যুক্তি দিন।
ধর্মীয় অবস্থান ব্যাখ্যা করুন।
কিন্তু একজন মানুষের ঘরে হামলা করবেন না।
তার বাবা-মাকে আঘাত করবেন না।
তার পরিচয়ের কারণে তাকে হত্যার ভাষা ব্যবহার করবেন না।
কারণ মতপার্থক্য একটি সভ্য সমাজের অংশ হতে পারে।
সহিংসতা নয়।
আজ আমি নিজের জন্য যতটা লিখছি, তার চেয়েও বেশি লিখছি আমার বাবা-মায়ের জন্য।
আমি চাই তারা এমন একটি পৃথিবীতে বাঁচুন যেখানে সন্তানের পরিচয়ের কারণে তাদের নিজেদের জীবন নিয়ে ভয় পেতে হবে না।
একজন সন্তানের কাছে তার বাবা-মায়ের আহত মুখের চেয়ে ভয়াবহ প্রতিবাদপত্র আর কিছু হতে পারে না।
তাই আজ আবার বলছি:
আমার পরিচয়ের সঙ্গে দ্বিমত করুন, কিন্তু আমার পরিবারের ওপর আঘাত করবেন না।
আমি সমকামী। কিন্তু সেই পরিচয়ের মূল্য আমার বাবা-মায়ের রক্ত হতে পারে না।