পরিবার, ঘর ও রাষ্ট্রের দায়
একজন সমকামী সন্তানের বাবা-মায়ের অপরাধ কী?
আমার জীবনের ঘটনাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কষ্টের জায়গা আমার বাবা-মা।
নিজের ওপর হুমকি এলে মানুষ হয়তো কোনোভাবে সেটি সহ্য করার চেষ্টা করতে পারে।
কিন্তু নিজের কারণে বাবা-মা বিপদের মধ্যে পড়েছেন মনে হলে সেই অনুভূতি বহন করা কঠিন।
আমি নিজেকে প্রশ্ন করি:
আমার বাবা-মায়ের অপরাধ কী?
তারা কি আমাকে জন্ম দিয়েছেন?
তারা কি আমাকে ভালোবাসেন?
একজন সন্তানের যৌন অভিমুখিতা যদি সমাজের কারও পছন্দ না হয়, তার দায় বাবা-মা কেন বহন করবেন?
কোনো বাবা-মাকে এমন পরিস্থিতিতে ফেলা উচিত নয় যেখানে তাদের সন্তানের পরিচয়ের কারণে নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তা করতে হয়।
আমাদের সমাজে সমকামী মানুষের পরিবারগুলোকেও তাই আলোচনার মধ্যে আনতে হবে।
তাদের ভয়, সামাজিক চাপ এবং নিরাপত্তার কথাও বলতে হবে।
কারণ ঘৃণা যখন একটি মানুষকে লক্ষ্য করে, অনেক সময় তার ঢেউ পুরো পরিবারকে আঘাত করে।
একজন বাবা কেন তার সন্তানকে ভালোবাসতে ভয় পাবেন?
আমার বাবার কথা মনে হলে একটি বিষয় আমাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।
একজন বাবা তার সন্তানকে নিরাপদ রাখতে চান।
এটাই স্বাভাবিক।
কিন্তু যখন সন্তান সমকামী, তখন অনেক পরিবারকে একটি অতিরিক্ত ভয় বহন করতে হয়।
সমাজ জানলে কী হবে?
কেউ ক্ষতি করবে কি?
সন্তানের ভবিষ্যৎ কী হবে?
আমার বাবাও আমাকে সতর্ক করতেন।
আমি অনেক সময় তার ভয়কে অতিরিক্ত মনে করতাম।
আমার মনে হতো, আমি কার সঙ্গে সম্পর্ক করব সেটি আমার ব্যাপার।
কিন্তু পরে বুঝেছি, বাবার ভয় আমার স্বাধীনতার বিরোধিতা থেকে সবসময় আসেনি।
অনেকটা এসেছিল আমাকে হারানোর আশঙ্কা থেকে।
আমি এমন একটি সমাজ চাই যেখানে কোনো বাবাকে সন্তানের যৌন পরিচয়ের কারণে তার জীবন নিয়ে আতঙ্কিত হতে হবে না।
একজন বাবা যেন নির্ভয়ে বলতে পারেন:
“তুমি আমার সন্তান। তোমার নিরাপত্তার অধিকার আছে।”
আমার বাড়ি যদি নিরাপদ না হয়, আমি কোথায় যাব?
“বাড়ি” শব্দটি শুনলেই আমাদের মনে নিরাপত্তার অনুভূতি আসে।
বাইরে যত সমস্যাই থাকুক, মানুষ ভাবে অন্তত নিজের বাড়িতে ফিরে দরজা বন্ধ করতে পারবে।
কিন্তু বাড়িই যখন ভয়ের জায়গা হয়ে যায়?
আমার বর্ণনা অনুযায়ী, আমার পরিবার একাধিকবার আমাদের বাড়িতে হামলার অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে।
তখন আমার মনে একটি প্রশ্নই ঘুরেছে:
নিজের বাড়িতেও যদি নিরাপত্তা না থাকে, তাহলে একজন মানুষ কোথায় যাবে?
একজন মানুষকে তার পরিচয়ের কারণে ঘরছাড়া হওয়ার কথা ভাবতে হবে কেন?
একটি বাড়ি শুধু ইট, কাঠ ও টিন নয়।
সেখানে স্মৃতি থাকে।
শৈশব থাকে।
বাবা-মায়ের জীবন থাকে।
সেই জায়গাটিকে আতঙ্কের জায়গায় পরিণত করা মানে শুধু সম্পত্তির ওপর আঘাত নয়, মানুষের মানসিক আশ্রয়ের ওপরও আঘাত।
আমি এমন সমাজ চাই যেখানে মানুষের বাড়ির নিরাপত্তা তার যৌন অভিমুখিতার ওপর নির্ভর করবে না।
অভিযোগ করতে গেলেও যদি পরিচয়ই আগে বিচার হয়?
একজন মানুষ হুমকির শিকার হলে কোথায় যাবেন?
স্বাভাবিক উত্তর, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে।
কিন্তু একজন সমকামী মানুষ যদি মনে করেন অভিযোগ জানাতে গেলে তার অভিযোগের আগে তার পরিচয় বিচার করা হবে, তখন পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
অভিযোগকারীর পরিচয় এবং অভিযোগের সত্যতা দুটি আলাদা বিষয়।
কেউ সমকামী হলেও তার বিরুদ্ধে হুমকি অপরাধ হতে পারে।
তার বাড়িতে হামলা হলে সেটিও তদন্তের বিষয়।
তার পরিবার আক্রান্ত হলে তাদেরও সুরক্ষার প্রয়োজন।
একজন নাগরিক যখন রাষ্ট্রের দরজায় দাঁড়ান, প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত তিনি কী বিপদের মধ্যে আছেন।
তিনি কাকে ভালোবাসেন, সেটি নয়।
রাষ্ট্রের সুরক্ষা যদি পরিচয় দেখে নির্ধারিত হয়, সবচেয়ে দুর্বল মানুষগুলোই প্রথমে নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ে।
৩৭৭: একটি সংখ্যা যখন জীবনের ওপর ছায়া ফেলে
একটি আইনের ধারা আইনজীবীর কাছে আইনি ভাষা।
কিন্তু যার বিরুদ্ধে সেই ধারায় মামলা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে, তার কাছে সেই সংখ্যা ভয় হয়ে দাঁড়াতে পারে।
আমার জীবনে ৩৭৭ ঠিক সেই অর্থ বহন করেছে।
আমার বর্ণনা অনুযায়ী, ২৮ জুন আমার ও আশিকের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারায় মামলা দায়ের করা হয়।
তারপর প্রশ্নটা আর শুধু সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার থাকেনি।
মামলা, গ্রেফতার এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয়ও এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
আমি আইনকে অস্বীকার করছি না।
আমি প্রশ্ন করছি আইনের প্রভাব নিয়ে।
দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ব্যক্তিগত ও সম্মতিপূর্ণ সম্পর্কের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র কত দূর পর্যন্ত প্রবেশ করবে, এই প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন।
ভালোবাসার সঙ্গে যখন কারাগারের ভয় যুক্ত হয়, তখন একজন মানুষের মানসিক অবস্থাটা কেমন হয়, সেটিও আমাদের ভাবতে হবে।