বাংলার বাতাসে যখনই মৌলবাদীরা মুখ খুলে, তখনই বুঝতে হয় যুক্তি আর মানবিকতা দুটোই বিপদে পড়েছে। তাদের সর্বশেষ রসিকতা—“বহু বিবাহ করলে সওয়াব”—এমন এক আজগুবি দাবি, যা শুনলে মনে হয় ধর্ম নয়, কোনো ভোগবিলাসী ক্লাবের প্রচারপত্র পড়ছি।
১. লম্পটতার ঢাল হিসেবে ধর্মকে ব্যবহার
মৌলবাদীরা বহু বিবাহের কথা বলে আসলে কী চায়?
ধর্মের ছাতা তুলে নিজেদের কামপ্রবণতাকে পবিত্র নাম দিতে।
নারীর সম্মান, অনুভূতি, অধিকার—এসব তাদের অভিধানে নেই।
তাদের কাছে নারী হলো পুরুষের ভোগের বস্তু, আর ধর্ম হলো সেই ভোগকে লিগ্যালাইজ করার স্ট্যাম্প।
এরা এমনই স্বার্থপর যে ধর্মকেও নিজেদের নোংরা আকাঙ্ক্ষার চাকর বানাতে পিছপা হয় না।
২. শর্তহীন ভোগবিলাসকে ধর্মের বিধান বলে চালানো
ধর্মে বহু বিবাহের জায়গা এসেছে কঠোর শর্তসাপেক্ষে—ন্যায়, দায়িত্ব, সমতা, আর্থিক ও মানসিক সক্ষমতা।
মৌলবাদীরা কী করে?
সব শর্ত কেটে ফেলে শুধু সুবিধাটা রেখে দেয়।
এমন চরম বিকৃতি দেখেও তারা নির্বিকার।
ধর্মের বিধানকে এমনভাবে কাটাছেঁড়া করে নিজেদের মতো সাজানো—এটা শুধু অজ্ঞতা নয়, সরাসরি প্রতারণা।
৩. বহু বিবাহের নামে পরিবার ধ্বংসের উৎসব
যেখানে একটি সংসারই অনেকের জন্য যুদ্ধ, সেখানে বহু সংসার চালানোর গল্প বললে সেটা জ্ঞান নয়—বেহায়াপনা।
স্ত্রী মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে,
সন্তান বিভক্ত হয়ে যায়,
আর্থিক চাপ বাড়ে,
দাম্পত্যে বিষ জমে।
যে বাস্তবতায় বহু বিবাহ মানে ধ্বংসস্তূপ, সেখানে মৌলবাদীরা এটাকে সওয়াব বানিয়ে মানুষের সামনে ছড়ায়।
এদের উদ্দেশ্য সওয়াব নয়—বিশৃঙ্খলা, আধিপত্য আর নারীকে বশীভূত রাখার পুরোনো কৌশল।
৪. নারীর অসম্মানকে ‘ধর্মীয়’ ভাষায় সাজানো
মৌলবাদীরা নারীর প্রতি এমন অবজ্ঞা দেখায় যেন নারীকে মানুষ হিসেবে স্বীকারই করতে তাদের ঘৃণা লাগে।
তারা নারীর অধিকার মানে না, মর্যাদা মানে না, সম্মতি মানে না—মানেই শুধু পুরুষের ইচ্ছা।
ধর্মে নারীকে সম্মান করতে বলা হয়েছে—আর মৌলবাদীরা সেই শিক্ষাকেই চূর্ণ করে নিজেদের পুরুষতান্ত্রিক দম্ভকে ধর্মের ব্যাখ্যা বলে চালায়।
এরা শুধু নারীশত্রু নয়—ধর্মশত্রুও।
৫. ধর্মীয় জ্ঞানহীনতার বাজারে সবচেয়ে বড় ব্যবসায়ী
মৌলবাদীদের মূল শক্তি হলো অজ্ঞ মানুষ।
ধর্মের প্রকৃত শিক্ষা না জানা মানুষদের ভয়ের মধ্যে রেখে, বিভ্রান্ত করে, তারা নিজেদের ক্ষমতার নেশা বাড়ায়।
তাদের বহু বিবাহ–তত্ত্ব আসলে নিজেদের সুবিধার চাকতি ঘোরানোর উপায়।
এরা ধর্ম প্রচার করে না—ধর্মকে ব্যবহার করে।
এরা সওয়াব আনে না—সওয়াবের নামে প্রতারণা করে।
এরা নৈতিক নয়—পাকাপাকি সুবিধাবাদী।
৬. সওয়াব আসে ন্যায় থেকে, কামনা পূরণ থেকে নয়
ধর্ম স্পষ্টভাবে বলেছে—ন্যায় করতে না পারলে একটিই যথেষ্ট।
এটাই মূলনীতি, এটাই নির্দেশ।
আর মৌলবাদীরা কী বলে?
“যত বেশি বিবাহ, তত বেশি সওয়াব!”
এমন বিপরীত কথা বলতে পারার জন্য হয় দুঃসাহস লাগে, নয় ধর্ম সম্পর্কে ভয়ঙ্কর অজ্ঞতা লাগে—দুটোই মৌলবাদীদের আছে।
উপসংহার: ধর্মকে বাঁচাতে হলে ভণ্ডামিকে চিনতে হবে
বহু বিবাহকে সওয়াবের কাজ বলা মূলত ঘৃণ্য মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ।
এটি নারীকে অমানবিক করে, পরিবারকে অস্থিতিশীল করে, সমাজকে দুর্বল করে, এবং ধর্মকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
মৌলবাদীরা ধর্মের রক্ষক নয়—ধর্মের ওপর আঘাতকারী।
ধর্মকে তাদের হাত থেকে রক্ষা করা মানে—মানবিকতা, ন্যায়বিচার এবং নারীর মর্যাদা রক্ষা করা।
মৌলবাদীরা ধর্মের নাম নিয়ে যতই চিৎকার করুক—ধর্ম তাদের ভোগবাদী কল্পনার বন্দী নয়।