মৌলবাদ অন্যান্য ধারণা বা মতবাদকে স্বেচ্ছাচারিতার নিদর্শন বলেই মনে করে।

এই ধর্মীয় মৌলবাদ স্বীকৃতি পাওয়ার পরই একাধিক প্রতিপক্ষ মতবাদের উত্থান ঘটে— যেমন, Scientism, Skepticism, Postmodernism, Existentialism, Pluralism, Liberalism, Secularism প্রভৃতি। যদিও এই সব মতবাদ একই রকম নয় এবং প্রতিটি ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে আলোকপাত করে, তবুও এদের একটি মৌলিক মিল রয়েছে— এরা সবাই মুক্তচিন্তার পক্ষপাতী। এদের অভিমত হল, যে-কোনও মত প্রতিষ্ঠার জন্য মৌলিক ধারণা প্রয়োজন হতে পারে, তবে প্রয়োজনে সেই ধারণা পরিবর্তন বা পরিবর্ধন করা যেতেই পারে। অর্থাৎ, একটিই মৌলিক ধারণা চিরকাল ধরে রাখার প্রয়োজন নেই।
কিন্তু বিপরীতভাবে, মৌলবাদ অন্যান্য ধারণা বা মতবাদকে স্বেচ্ছাচারিতার নিদর্শন বলেই মনে করে। মৌলবাদীদের মতে, বিপরীত মতগুলির কোনও সুসংহত মূলনীতি বা তাত্ত্বিক দায়বদ্ধতা নেই। সুতরাং, এসব মতবাদ এক ধরনের স্বেচ্ছাচারিতায় রূপান্তরিত হয়েছে মাত্র। এই বিচ্ছিন্ন ও ভিত্তিহীন ভাবনা সমাজ কিংবা ধর্মকে রক্ষা করতে পারে না। সেই যুক্তিতেই মৌলবাদ নিজেকে মূলের প্রতি আস্থাশীল, রক্ষণশীল একটি মতবাদ হিসেবে স্থাপন করে, এবং তা-ই শ্রদ্ধেয় ও গ্রহণযোগ্য হওয়া উচিত বলে মনে করে। ধর্মীয় সমাজকে মৌলবাদই রক্ষা করতে সক্ষম— এমন বিশ্বাস তাদের।
তবে বাস্তব অভিজ্ঞতা আমাদের ভিন্ন এক চিত্র দেখিয়েছে— সারা বিশ্বজুড়ে আমরা মৌলবাদের তাণ্ডব প্রত্যক্ষ করেছি। ভারতবর্ষেই জাতির জনক মহাত্মা গান্ধি, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধি এবং তাঁর পুত্র রাজীব গান্ধি— তিনজনেই মৌলবাদী হামলার শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। মহাত্মা গান্ধি নিহত হন হিন্দু মৌলবাদীদের হাতে, ইন্দিরা গান্ধি শিখ মৌলবাদীদের গুলিতে, এবং রাজীব গান্ধি নিহত হন শ্রীলঙ্কার একটি মৌলবাদী সংগঠনের আত্মঘাতী হামলায়। আজ মৌলবাদের এই আক্রমণ সীমা ছাড়িয়ে গেছে। আমরা সব সময় এক অজানা সন্ত্রাসের আশঙ্কায় থাকি, বিশেষত ধর্মীয় মৌলবাদী আক্রমণের প্রসঙ্গে। আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি— এই মৌলবাদ কখনোই পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হবে না। তবে আপাতত এর ফলাফল যতটা আশঙ্কাজনক, ভবিষ্যতেও তা একইরকম থাকবে কি না— সেটা নিশ্চিত করে বলা যায় না।
আমাদের বোঝা দরকার, ধর্মীয় মৌলবাদ কেন সৃষ্টি হয়। প্রকৃতপক্ষে, যদি আমরা ‘ধর্ম’ শব্দটিকে কেবল ইংরেজি ‘religion’ অর্থে না নিয়ে সংস্কৃত ‘ধৃ’ ধাতু থেকে আগত মূল অর্থ— ‘ধারণ করে যা’— এই ব্যাখ্যায় বুঝি, তাহলে দেখা যাবে ধর্ম হল এক রক্ষণশীল শক্তি, যা সমস্ত কিছুকে সংহত করে ধরে রাখে। কোনও ধর্ম যদি ভাঙন, লয় কিংবা সংঘর্ষ ঘটায়, তাহলে তা প্রকৃত অর্থে ‘ধর্ম’ নামে চিহ্নিত হওয়ার যোগ্য নয়। যাঁরা অস্ত্র ধারণ করেন, তাঁদের মনে দেশপ্রেম বা ধর্মীয় গৌরবের একটি অনুভব হয়তো কাজ করে— এ কথা অস্বীকার করা যায় না। সেই আবেগের বশে তাঁরা সহজেই প্ররোচিত হন এবং ভয়ংকর মৃত্যুযজ্ঞে অংশগ্রহণ করেন। কিন্তু কোনও ব্যক্তি যদি সত্যিকারের ধর্মজ্ঞান অর্জন করেন, তবে তিনি অন্যকে হত্যা করবেন— এমন সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।