- ভাস্কর্যের বিরুদ্ধে মৌলবাদীরা—এ শুধু ধর্মের লড়াই নয়, রাজনীতির মাঠ দখলের খেলা
বাংলাদেশে ভাস্কর্যবিরোধী মৌলবাদীরা যখন রাস্তায় নামে, তখন তারা আসলে ধর্ম রক্ষা করতে নামে না—
তারা নামে রাজনৈতিক জায়গা দখল করতে।
ভাস্কর্য তাদের কাছে ধর্মীয় ইস্যু নয়; ভাস্কর্য হলো একটি রাজনৈতিক অস্ত্র, যার মাধ্যমে তারা রাষ্ট্রের ওপর নিজেদের প্রভাব বিস্তারের পরীক্ষা চালায়।
—
মৌলবাদীরা ভাস্কর্যবিরোধী নয়—তারা মুক্তিযুদ্ধবিরোধী রাজনৈতিক চেতনার ধারক
সোজা কথা:
যারা ভাস্কর্যকে হারাম বলে চিৎকার করে,
তারা সেই রাজনৈতিক ধারার উত্তরসূরি
যারা ১৯৭১-এ বাংলাদেশের পক্ষে ছিল না।
কারণ ভাস্কর্য মানে স্মৃতি।
স্মৃতি মানে মুক্তিযুদ্ধ।
মুক্তিযুদ্ধ মানে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র।
আর ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র মানেই মৌলবাদীদের সবচেয়ে বড় শত্রু।
ভাস্কর্য ভেঙে তারা আসলে এই রাষ্ট্রের ভিত্তিপ্রস্তরেই আঘাত করতে চায়।
—
ধর্ম নয়, ভাস্কর্যবিরোধিতায় আছে রাষ্ট্রক্ষমতার গণিত
যে কোনো মৌলবাদী আন্দোলনের মূল লক্ষ্য দুটি:
1. রাস্তা দখল করা – দেখানো, “আমরাই জনগণ।”
2. রাষ্ট্রকে ভয় দেখানো – বার্তা দেওয়া, “আমাদের দাবির সামনে নতি স্বীকার করো।”
ভাস্কর্য তাদের কাছে খুবই সুবিধাজনক টার্গেট।
কারণ:
ভাস্কর্য রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে তৈরি হয়।
এটিকে ঘিরে দ্রুত উত্তেজনা সৃষ্টি করা যায়।
ধর্মের নামে ইস্যু বানানো সহজ।
রাজনৈতিক দর-কষাকষিতে এটি bargaining chip হিসেবে কাজ করে।
অতএব, ভাস্কর্য হারাম বলা ধর্মীয় নয়, রাজনৈতিক কৌশল।
—
**যেসব দেশে মৌলবাদ ক্ষমতা পায়, সেসব দেশে প্রথমেই ভাঙা হয় প্রতীক—
কারণ প্রতীক ভাঙলে জাতির মনোবল দুর্বল হয়**
তালেবানরা বামিয়ান বুদ্ধ ভেঙেছিল কেন?
আইএস কেন যুদ্ধে প্রত্নভাণ্ডার উড়িয়ে দিয়েছিল?
কারণ প্রতীক ভাঙা মানেই জনগণের মনে ভয় ঢুকানো।
বাংলাদেশে মৌলবাদীরাও সেই একই খেলার ক্ষুদ্র সংস্করণ চালায়।
তারা জানে:
জাতীয় প্রতীকগুলো দাঁড়িয়ে থাকলে
বাঙালির আত্মপরিচয় শক্তিশালী থাকে।
আর আত্মপরিচয় শক্তিশালী থাকলে
মৌলবাদ টিকতে পারে না।
—
ভাস্কর্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো মানে এই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া
এটা ধর্মীয় বা নৈতিক বিতর্ক নয়—
এটা সরাসরি রাজনৈতিক অবস্থান।
যে ভাস্কর্য শহিদদের স্মৃতিতে, ভাষা আন্দোলনের স্মরণে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় তৈরি—
তা ভাঙার হুমকি দেওয়া
অর্থাৎ রাষ্ট্রের ইতিহাস অস্বীকার করা,
বাঙালি জাতিসত্তাকে অস্বীকার করা,
এবং বাংলাদেশের জন্মকাহিনিকেই হারাম ঘোষণা করা।
মৌলবাদীরা ঠিক এটাই চায়—
রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক ভিত্তি মুছে ফেলতে।
—
**ধর্ম দিয়ে ঢেকে রাখা যায়, কিন্তু এ লড়াই ধর্মের নয়—
এ লড়াই রাজনৈতিক আধিপত্যের**
যে কারণে মৌলবাদীরা ভাস্কর্যের বিরুদ্ধে:
কারণ ভাস্কর্য ধর্মীয় পরিচয়ের ওপর জাতীয় পরিচয়কে শক্তিশালী করে।
কারণ ভাস্কর্য দেখলে মানুষ ইতিহাস মনে করে।
কারণ ভাস্কর্য শিল্পকে জীবিত রাখে, আর শিল্প মৌলবাদের শত্রু।
কারণ ভাস্কর্য দাঁড়িয়ে থাকলে রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র দৃশ্যমান থাকে।
তাই তাদের উদ্দেশ্য স্পষ্ট—
বাংলাদেশকে পাকিস্তানমুখী করা,
সংস্কৃতিকে দুর্বল করা,
ধর্মকে রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা।
—
শেষ কথা: ভাস্কর্য ভাঙা মানে রাষ্ট্রের হৃদয়ে আঘাত
মৌলবাদীরা চিৎকার করতে পারে—ভাস্কর্য হারাম!
কিন্তু সত্য হলো—
হারাম তাদের সেই রাজনীতি, যা ধর্মকে ঢাল বানিয়ে রাষ্ট্রকে দুর্বল করতে চায়।
ভাস্কর্যকে হারাম বলা মানে
এই দেশের আত্মা হারাম বলা।
এই দেশের ইতিহাস হারাম বলা।
এই দেশের অস্তিত্বের কারণই হারাম বলা।
ভাস্কর্য শুধু পাথর নয়—
এটি রাষ্ট্রের প্রতিজ্ঞা।
যারা এটি ভাঙতে চায়,
তারা রাষ্ট্রকেই ভাঙতে চায়।