সমসাময়িক বাংলাদেশে ভাস্কর্যবিরোধী আন্দোলন যেন প্রতি কয়েক বছর পর পরই মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। দাবি করা হয়, ভাস্কর্য নাকি ‘হারাম’, নাকি ‘মূর্তি পূজা’। অথচ প্রশ্ন হচ্ছে—আসলে কে এই দাবি করছে, এবং কেন করছে? ভাস্কর্য সম্পর্কে ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা কি সত্যিই এত সরল, নাকি এর পেছনে রয়েছে আরও গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজলেই বোঝা যায়, মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলো ভাস্কর্যবিরোধিতাকে যতটা ধর্মীয় ইস্যু বানিয়ে প্রচার করে, বাস্তবে এটি তার চেয়ে অনেক বেশি রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং ক্ষমতার খেলা।
—
মূর্তি ও ভাস্কর্য—দুইটিকে এক করার ইচ্ছাকৃত কৌশল
ইসলাম মূর্তি পূজাকে নিষিদ্ধ করেছে—এখানে কোনো বিতর্ক নেই। কিন্তু ভাস্কর্যকে ‘মূর্তি’ হিসেবে প্রচার করা একটি রাজনৈতিক প্রচারণা; কারণ ভাস্কর্য স্বভাবতই উপাসনার বস্তু নয়। একজন মুক্তিযোদ্ধার প্রতিকৃতি, ভাষা আন্দোলনের স্মারক, কিংবা কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের ভাস্কর্য—এসবের সাথে পূজা-পার্বণের কোনো সম্পর্ক নেই। এগুলো আমাদের ইতিহাস, স্মৃতি ও সংস্কৃতির অংশ।
কিন্তু মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলো এই স্পষ্ট পার্থক্যটিকে অস্বীকার করে, কারণ বিভ্রান্তি ছড়ানোই তাদের মূল উদ্দেশ্য। মূর্তি ও ভাস্কর্যের সংজ্ঞাকে ইচ্ছাকৃতভাবে এক করে তারা সাধারণ মানুষকে বোঝাতে চায় যে রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক প্রতীকগুলো নাকি ধর্মবিরোধী।
—
ইতিহাসকে প্রেক্ষাপটহীনভাবে টেনে আনা
প্রাচীন আরবে মূর্তি পূজা ছিল, তাই সেই সমাজের বাস্তবতা অনুযায়ী কিছু নিষেধাজ্ঞা এসেছে। কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রে ভাস্কর্য হলো—
শিল্পের প্রকাশ,
ইতিহাসের চিহ্ন,
সমাজের স্মৃতি,
নান্দনিকতার বহিঃপ্রকাশ।
মৌলবাদীরা এই প্রেক্ষাপট বদলে যাওয়া বাস্তবতাকে স্বীকার করতে চায় না। কারণ তারা জানে—মানুষ যদি ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ ও সংস্কৃতির প্রতি গর্ববোধ করে, তবে তাদের ধর্মীয় রাজনীতির জায়গা সংকুচিত হয়ে যায়।
—
সংস্কৃতি দখলের রাজনীতি
যেকোনো আধুনিক জাতিরাষ্ট্র তার ইতিহাস ও মূল্যবোধকে ভাস্কর্য, স্মৃতিস্তম্ভ, শিল্প ও স্থাপত্যে লিপিবদ্ধ করে। এগুলো জাতির পরিচয় গড়ে তোলে। কিন্তু মৌলবাদী শক্তিগুলো চায় ধর্মীয় পরিচয়ই যেন মানুষের প্রধান পরিচয় হয়ে দাঁড়ায়—জাতীয় পরিচয় নয়।
এই কারণেই তারা মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য, ভাষা শহিদদের স্মৃতিস্তম্ভ অথবা বাঙালি সংস্কৃতির প্রতীকগুলোতে আক্রমণ চালায়। তাদের লক্ষ্য খুব স্পষ্ট: রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক ভিত্তিকে দুর্বল করা, যাতে ধর্মীয় রাজনৈতিক শক্তি নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করতে পারে।
—
স্বাধীন চিন্তার প্রতি মৌলবাদীদের চিরাচরিত বিরোধিতা
শিল্প মানে প্রশ্ন করা। শিল্প মানে স্বাধীনতা।
এবং স্বাধীন চিন্তাই হলো মৌলবাদবিরোধী চেতনার সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
ভাস্কর্য, সাহিত্য, সংগীত, চিত্রকলা—এসব মৌলবাদী গোষ্ঠীর কাছে স্বভাবতই সন্দেহজনক, কারণ এগুলো সমাজকে নতুনভাবে চিন্তা করতে শেখায়। মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারিত হয়। আর মানুষের মন যত মুক্ত হয়, মৌলবাদীদের প্রভাব তত কমে।
তাই তারা শিল্পকে ‘পাপ’, ভাস্কর্যকে ‘হারাম’, সংস্কৃতিকে ‘অইসলামিক’ হিসেবে চিত্রিত করে মানুষের মানসিক পরিসরকে সংকুচিত রাখতে চায়।
—
ধর্মীয় গ্রন্থের জটিল ব্যাখ্যাকে সরলীকরণ
ইসলামের ফিকহ, দর্শন, ব্যাখ্যা—এসবই বহুস্তরীয়। বহু আলেম স্পষ্টভাবে বলেছেন—
উপাসনার উদ্দেশ্য না থাকলে ভাস্কর্য হারাম নয়,
ঐতিহাসিক বা জাতীয় প্রতীক হিসেবে ভাস্কর্যের কোনো ধর্মীয় সমস্যা নেই।
কিন্তু মৌলবাদীরা সবসময় কঠোরতম ব্যাখ্যাকে চাপিয়ে দেয়, কারণ কঠোরতা তাদের রাজনীতিকে পুষ্ট করে। ধর্মীয় ব্যাখ্যার এই বিকৃতি তাদের কাছে একটি কার্যকরী টুল—ভয় দেখানো এবং আনুগত্য আদায় করার জন্য।
—
জনগণকে উত্তেজিত রাখার কৌশল
ভাস্কর্যবিরোধী আন্দোলন করে মৌলবাদীরা কয়েকটি সুবিধা পায়:
1. ধর্ম রক্ষার নামে নেতৃত্ব দাবি করতে পারে
2. রাজনৈতিক দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়াতে পারে
3. সমাজে উত্তেজনা সৃষ্টি করে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারে
অর্থাৎ ভাস্কর্য ‘হারাম’—এটি ধর্মীয় নয়, বরং একটি গভীর রাজনৈতিক প্রজেক্ট।
—
শেষ কথা
মৌলবাদীরা ভাস্কর্যকে হারাম মনে করে না—তারা ভাস্কর্যকে হারাম বলে প্রমাণ করতে চায়, কারণ এতে তাদের রাজনৈতিক লাভ আছে।
ধর্মীয় যুক্তি তাদের অস্ত্র, কিন্তু লক্ষ্য ভিন্ন:
সংস্কৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করা, জাতির পরিচয়কে দুর্বল করা এবং মানুষের চিন্তাকে সংকুচিত রাখা।
যে সমাজ নিজের ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে লালন করে, সেই সমাজে মৌলবাদ কখনোই শক্ত ভিত্তি গড়তে পারে না। তাই ভাস্কর্যবিরোধিতা আসলে ধর্মের নয়, সভ্যতার বিরুদ্ধে একটি পরিকল্পিত আঘাত।