আমাকে না পেয়ে আমার প্রকাশককে গ্রেফতার—৮ সেপ্টেম্বরের গ্রেফতার ছিল ভয় দেখানোর আয়োজন, ন্যায়বিচারের নয়

মৌলবাদী মামলা, রাষ্ট্রের নীরবতা, আর এক নিরীহ প্রকাশকের গ্রেফতার—এটি ব্যক্তিগত হামলা নয়, এটি মুক্তচিন্তার ওপর আক্রমণ

৫ সেপ্টেম্বর মৌলবাদীরা আমার বিরুদ্ধে মামলা করল।
মামলাটি স্পষ্টভাবে ছিল আমাকে চুপ করানোর কৌশল—
বাকস্বাধীনতাকে আইনি জালে আটকে ফেলার চেষ্টা।

কিন্তু তারা আমার কাছে পৌঁছাতে পারেনি।
তারা আমাকে গ্রেফতার করতে পারেনি।
তারা আমাকে থামাতে পারেনি।

তখনই ঘটল আরেকটি ভয়ঙ্কর দৃশ্য—
৮ সেপ্টেম্বর, আমাকে না পেয়ে তারা গ্রেফতার করল আমার বইয়ের প্রকাশক এমডি সাগরকে।

প্রকাশক!
যে মানুষ লেখকের পাণ্ডুলিপি ছাপায়, বই সাজায়, বই হাতে তুলে দেয়—
অপরাধী কি তিনি?

—

এটি গ্রেফতার নয়—এটি ভয় দেখানোর নাটক

এমডি সাগর কোনো লেখক নন, কোনো মতাদর্শগত কর্মী নন, কোনো ব্লগারও নন।
তিনি একজন প্রকাশক—
আমার বই ছাপানোর কারণে নাম এসেছে।

তাহলে তাঁকে কেন গ্রেফতার করা হলো?

অভিযোগ স্পষ্ট:
যখন লেখককে পাওয়া যায় না, তখন প্রকাশককে টার্গেট করো।
এটাই মৌলবাদী ভয়-রাজনীতির কৌশল।

এটি আইন প্রয়োগ ছিল না—
এটি ছিল একটি সংকেত,
একটি বার্তা,
একটি হুমকি—

“তুমি লিখলে, তোমার বই ছাপানো সবাইকেই আমরা থামাতে পারবো।”

এটি ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা নয়—
এটি প্রকাশকদের ভয় পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টা।

—

একজন প্রকাশককে গ্রেফতার মানে লেখার স্বাধীনতার শেকড় কেটে ফেলা

প্রকাশক সমাজের এক মেরুদণ্ড—
তিনি লেখার স্বাধীনতার সহযোদ্ধা।

যখন প্রকাশককে গ্রেফতার করা হয়,
তখন কেবল একজন মানুষকে নয়—
পুরো চিন্তা প্রকাশের অবকাঠামোকে আক্রমণ করা হয়।

এই গ্রেফতার বলতে চায়—

লেখককে ভয় দেখাও,

প্রকাশককে ভয় দেখাও,

ছাপাখানাকে ভয় দেখাও,

বইয়ের দোকানকে ভয় দেখাও,

পাঠককে বার্তা দাও—“বইও অপরাধ।”

যে সমাজে বই অপরাধ হয়,
সে সমাজে বাকস্বাধীনতা মৃত।

—

রাষ্ট্রের নীরবতা আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে

২৬ জুলাই হামলার সময় রাষ্ট্র নীরব ছিল।
১০ আগস্ট “ফাঁসির দাবি” সমাবেশের সময় রাষ্ট্র নীরব ছিল।
৫ সেপ্টেম্বর আমার বিরুদ্ধে মামলা—রাষ্ট্র নীরব ছিল।
এখন ৮ সেপ্টেম্বর প্রকাশক গ্রেফতার—রাষ্ট্র আবারও নীরব।

এই নীরবতা কি অনিচ্ছাকৃত?
নাকি এটি এক ধরনের নৈতিক দুর্বলতা?
নাকি এটি মৌলবাদী চাপের প্রতি আত্মসমর্পণ?

নীরবতা কোনো নিরপেক্ষতা নয়—
নীরবতা আক্রমণকারীদের পাশে দাঁড়ানো।

রাষ্ট্র যখন সত্যের পাশে না দাঁড়ায়,
তখন অন্ধকার সাহস পায়।

—

প্রকাশকের প্রতি আমার অপরিসীম শ্রদ্ধা—কারণ তিনি আমার লেখা ছাপাতে ভয় পাননি

এমডি সাগর কোনো যোদ্ধা হিসাবে বই ছাপাননি,
তিনি একজন পেশাজীবী হিসাবে ছাপিয়ে ছিলেন।
কিন্তু রাষ্ট্রীয় গ্রেফতার তাকে অজান্তেই
চিন্তার যুদ্ধে একজন সৈনিক বানিয়ে দিয়েছে।

তিনি আমার কারণে গ্রেফতার হয়েছেন—
এটি আমার ব্যক্তিগত যন্ত্রণার চেয়েও বড় এক সামাজিক লজ্জা।

যে দেশে প্রকাশক নিরাপদ নয়—
সেই দেশে লেখক কি নিরাপদ?

—

এটি শুধু আমার লড়াই নয়—এটি বাংলাদেশে বইয়ের ভবিষ্যতের লড়াই

আজ আমাকে টার্গেট করা হচ্ছে,
আমার প্রকাশককে টার্গেট করা হচ্ছে।

আগামীকাল—

কোনো উপন্যাসের প্রকাশক?

কোনো কবিতা বইয়ের প্রকাশক?

কোনো গবেষণা বইয়ের প্রকাশক?

কাকে টার্গেট করা হবে?

যদি প্রকাশকের বিরুদ্ধে মামলা করে লেখাকে থামানো যায়,
তাহলে একদিন কেউই সাহস করবে না বই ছাপাতে।
তখন মৌলবাদীরা জয়ী হবে—
কলম নয়, ভয় হবে সমাজের চালক শক্তি।

—

শেষ কথা: ৮ সেপ্টেম্বরের গ্রেফতার আমাকে ভয় দেখায়নি—বরং আরও স্পষ্ট করেছে যে আমার কলম প্রয়োজন

যারা আমাকে না পেয়ে আমার প্রকাশককে গ্রেফতার করল,
তারা আসলে নিজেদের বহনক্ষমতার সীমা দেখিয়েছে।

তাদের উদ্দেশ্য ছিল—
আমাকে থামানো।

কিন্তু ফল হলো—
আমার ক্ষোভ আরও শক্ত হলো,
আমার লেখার যুক্তি আরও তীব্র হলো,
আমার প্রতিরোধ আরও দৃঢ় হলো।

আমি লিখে যাবো।
কারণ যদি আজ আমরা লেখার স্বাধীনতা রক্ষা না করি,
আগামী প্রজন্মের হাতে কোনো বই থাকবে না।

আজ প্রকাশক গ্রেফতার—
কাল হয়তো পাঠকই অপরাধী হয়ে যাবে।

আমি বেঁচে আছি—
তাই লিখছি।
এবং লিখব।